ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হওয়ার পেছনে কতকগুলো কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায় করা এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসমিদেরকে মুক্ত করা। এছাড়াও তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের এক দশকের রাজনৈতিক ও সর্বগ্রাসী দমন-নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য এবং ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা দাবির ভিত্তিতে ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব-বাংলার সাধারণ জনগণ কর্তৃক যে গণআন্দোলন সংগঠিত হয় তাই ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত।


ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ ও উদ্দেশ্য:

উপমহাদেশের বিভক্তির পর থেকে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ বিভিন্নভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছিল। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পর্বতসম বৈষম্য বিরাজমান ছিল।

দীর্ঘ এক দশকের স্বৈর শাসনের কারণে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অস্থিরতার জন্ম হয় তারই প্রেক্ষাপটে সংগঠিত হয় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-আন্দোলন। যা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। এই গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখযোগ্য কিছু লক্ষ ও উদ্দেশ্য নিচে দেওয়া হলো:


০১। পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নেওয়া।
০২। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণ।
০৩। সামরিক-বেসামরিক আমলাদের কর্তৃত্ব ও দৌরাত্ব হ্রাস করা।
০৪। গণতন্ত্রের পূর্ণ বাস্তবায়ন।
০৫। সকল গণবিরোধী এবং অশুভ শক্তির মূলোৎপাটন।
০৬। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ করা।


ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতার উচ্চাভিলাষী স্বৈরশাসক আইয়ুব খান উগ্র আক্রমণাত্বক নীতি থেকে নমনীয় পর্যায়ে পৌছে। এবং গণআন্দোলনের ফলে দিশেহারা হয়ে ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তিসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।


সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এগারো দফা দাবি:

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাদের এই দাবিগুলো ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কর্মসূচী। ১১ দফা দাবি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। ১১ দফা কর্মসূচী পরবর্তীতে ছয় দফার সাথে মিলিতভাবে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাতে সাহায্য করে।

তারই ধারাবাহিকতায় Students Action Committee (SAC) ও আওয়ামীলীগের ছয় দফাকে অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম কমিটি এগারো দফা দাবি পেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে SAC -এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ১৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্রসভায় ১১ দফা পড়ে শোনানো হয়। নিচে এগারো দফা কর্মসূচীতে উত্থাপিত দাবিগুলো তুলে ধরা হলো:


০১। জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কলাকানুন বাতিল ঘোষণা এবং বেতন ও অন্যান্য ফি কমিয়ে শিক্ষার ব্যয়সংকোচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
০২। সার্বজনীন ভোটের ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করতে হবে।
০৩। পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
০৪। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে নিয়ে একটি সাব ফেডারেশন গঠন এবং তার অন্তর্গত প্রদেশগুলোতে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।
০৫। ব্যাংক, বিমা, পাটের ব্যবসা ও অন্যান্য বড় শিল্পগুলো জাতীয়করণ করতে হবে।
০৬। কৃষকদের ওপর থেকে খাজনা ও ট্যাক্সের হার কমানো, বকেয়া খাজনা ও ঝণ মওকুফ। সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল ও তহশিলদারদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে।
০৭। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বোনাস দিতে হবে এবং শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
০৮। পূর্ব-পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জনসম্পদের সার্বিক ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।
০৯। জরুরি আইন, নিরাপত্তা আইন ও সকল নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।
১০। সিয়াটো, সেনটো, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১১। সব রাজবন্দিদের মুক্তিদান এবং আগরতলা মামলা ও সমস্ত রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।


উপরিউক্ত, আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে- এগারো দফা হচ্ছে বাঙালি জাতির মুক্তির রক্ষাকবচ। এই এগারো দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সূচিত হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তির পর থেকেই পশ্চিম-পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি যে বৈষম্য প্রদর্শন করেছিল তারই প্রতিবাদস্বরূপ ১১ দফা দাবি উত্থাপিত হয়েছিল।


তথ্য সংগ্রহ করে লিখেছেন: Al-Amin Islam

আরো পড়ুন: