পাকিস্তান সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ | ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে এদেশে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত হয়। এরপর ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ প্রতিরোধ করে ইংরেজরা তাদের শাসন কর্তৃত্ব পাকাপোক্ত করে। ১৮৫৭ সালে এ বিদ্রোহের দায়-দায়িত্ব ইংরেজরা মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন।

ফলে হিন্দু-মুসলিম দুই জাতির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। আর এই বিরোধের সূত্র ধরেই দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাক-ভারত বিভক্ত হয়। বস্তুতপক্ষে উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়।

গোটা ঔপনিবেশিক শাসনের কালপর্বে বিশেষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি দরুন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে ভারতের মুসলমানেরা একটি নিজস্ব রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কংগ্রেস দেশবিভাগের সকল প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্র ও দায়িত্বশীল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতি সমর্থন জানায়।

১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হয়ে ছিল নিম্নে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ আলোকপাত করা হলো :

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ :

০১। ব্রিটিশ শাসন পদ্ধতি : ব্রিটিশ শাসন পদ্ধতি ছিল মূলত Divide and Rule Policy নির্ভর। অর্থাৎ বিভিন্ন জাতির মাঝে বিভেদ সৃষ্টি ও শাসন করা। ব্রিটিশরা ছিল মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবাপন্ন। তারা হিন্দুদেরকে যতবেশি প্রাধান্য দিতো তার সিকি ভাগও দিত না মুসলমানদেরকে। সুতরাং, মুসলমান ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রতি ব্রিটিশদের এহেন অবহেলা এবং হিন্দুদের প্রতি অসহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব মেনে নিতে পারেনি। যার কারণে মুসলমানদের মাঝে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা কাজ করে।

০২। কংগ্রেস হিন্দু প্রাধান্য : ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক প্লাটফরম হিসেবে ১৮৮৬ সালে ‘সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ আত্মপ্রকাশ করে। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মূল কারণ ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সৃষ্টি ও ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ হতে নিজেদেরকে মুক্ত করা। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, জাতীয় কংগ্রেসের হিন্দুদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায় এবং মুসলমানরা অবহেলিত হয়, যার ফলে অবহেলিত মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাঝে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের চেতনা জাগ্রত হয়।

০৩। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা : ১৮৮৬ সালে ২২ ডিসেম্বর ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম Political Platform All Indian National Congress প্রতিষ্ঠার পেছনে যে উদ্দেশ্য নিহিত ছিল তা পূরণে ব্যর্থ হয়। সেখানে বৈষম্য সৃষ্টি করে মুসলমানদেরকে অবহেলা করা হয় এবং সকল কার্যক্রমে হিন্দুদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। Indian National Congress হিন্দুদের সংবিধানে পরিণত হয়। যার ফলে মুসলিমরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম দেওয়া হয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯০৬ সালে। এর প্রথম সম্মেলন হয় ঢাকার শাহবাগে। মুসলিম দেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের নতুন রাষ্ট্র গঠনের চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

০৪। মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিকাশ লাভ : হিন্দুরা যখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে
বেগবান হয়ে উঠল তখন মুসলিম জাতীয়তাবাদীরাও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আলাদা রাজনৈতিক দল গঠনে এগিয়ে আসতে
থাকল। এভাবে এক পর্যায়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।

০৫। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রভাব : ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন প্রবর্তিত বঙ্গভঙ্গ ব্যবস্থার ফলে মুসলমানরা বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করে। মুসলমানদের ভোগকৃত এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা হিন্দুদের মনে হিংসার আগুন প্রজ্বলিত করে। যার ফলে তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। এক পর্যায়ে উগ্র হিন্দুদের অসহযোগ ও সন্ত্রাসী আন্দোলনের ফলে ১৯২২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।
এতে হিন্দু ও মুসলিমদের মাঝে বিদ্যমান সম্প্রীতিতে ফাটল ধরে এবং মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আশা ব্যক্ত

০৬। লাহোর প্রস্তাব : ১৯৩৯ সালের মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর Two Nations Theory-এর ভিত্তিতে পাকিস্তানের লাহোরে ১৯৫০ সালের শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক লাহোরে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উক্ত প্রস্তাবের মধ্যে বলা হয় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ করে। নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা হবে এবং এ দাবির প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের পাকিস্তান নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।

০৭। সাম্প্রদায়িক সংঘাত : পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক কারণ হিসেবে ১৯৪৬ সালে ভারতের অভ্যন্তরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে দায়ী করা যায় অনেকাংশে। কারণ ১৯৪৬ সালে ভারতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাতে প্রচুর মানুষ হতাহত হয়। এতে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার কারণে মুসলমানদের মাঝে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা জাগ্রত হয়।

০৮। চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য : ব্রিটিশরা ‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। এজন্য তারা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বদা বিভেদ লাগিয়ে রাখার চেষ্টা করত। তাছাড়া ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক দিক থেকে ইংরেজরা হিন্দুদের প্রতি একটু বেশি সহানুভূতিপ্রবণ ছিল। এজন্য তারা তৎকালীন সরকারি, বেসরকারি উচ্চ পর্যায়ে কর্মকর্তা নির্বাচনে মুসলিমদের তুলনায় হিন্দুদের সহানুভূতি প্রাধান্য দিত। বস্তুত, চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দুদের একচেটিয়া নিয়োগ মুসলমানদের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা পরববর্তীতে পাকিস্তান নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

০৯। শিল্পকারখানা স্থাপনে বৈষম্য : ব্রিটিশরা তাদের ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিভিন্ন শিল্পকারখানা কোথায় স্থাপিত হবে আর কোথায় স্থাপিত হবে না সে ব্যাপারে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। বস্তুত এ বৈষম্যমূলক নীতি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যদি সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করা যায় তৎকালীন কলকাতা, মুম্বাই, মাদ্রাজ কিংবা অন্যান্য হিন্দু অধ্যুষিত শহরে শিল্পকারখানার মাত্রা কিরূপ ছিল। পক্ষান্তরে, মুসলিম অধ্যুষিত ঢাকা, লাহোর, করাচি প্রভৃতি শহরে কলকারখানার চিত্র কিরূপ ছিল। আর এ কারণেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

১০। রাজস্ব খাত হতে খরচ সম্পর্কিত বৈষম্য : কলকাতা, মুম্বাইসহ অন্য সব হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় যুদ্ধের খরচ এবং
কোম্পানির কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হতো বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের রাজস্ব খাত থেকে। মূলত এতে করে মুসলিম
অধ্যুষিত অঞ্চলের রাজস্ব খাত প্রতিবছর একেবারে শূন্যের কোঠায় পড়ে যেত। ফলে এসব অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা তাদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনে উৎসাহিত করে।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ১৭৫৭ সালে পলাশির আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী এ উপমহাদেশে তাদের কলোনি স্থাপন করেছিল। আর এ কলোনি টিকে ছিল প্রায় ২০০ বছর।

এ ২০০ বছরে তারা এমন সব সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও বৈষম্যমূলক আচরণের জন্ম দেয়, যার ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ভারত নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র জন্মলাভ করে।

আরো পড়ুুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!