পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক পটভূমি

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক পটভূমি || ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। বস্তুত ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাংলার শেষ ও স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী এ উপমহাদেশে যে ঔপনিবেশের ভিত গড়েছিল তা প্রায় ২০০ বছর টিকেছিল।

আর এ ২০০ বছরে এখানে যেসব ঘটনাপ্রবাহ সৃষ্টি হয় তার মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক বিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক ভাবধারার জন্ম, দ্বিজাতিতত্ত্বের আবির্ভাব প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মূলত এসব ঘটনা প্রবাহের সামষ্টিক রূপ হিসেবে এ উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

প্রায় হাজার মাইলেরও বেশি ব্যবধানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন দুটি ভূ-খণ্ড নিয়ে কায়েদে আজমের ‘দ্বি-জাতিতত্ত্ব’ মতবাদের ভিত্তিতে সুবিচার ন্যায়নীতি ও ধর্মভিত্তিক এক সুখী সমৃদ্ধশালী ও প্রগতিশীল নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার মহান উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকচক্র, সংকীর্ণ আমলাতান্ত্রিক, গোষ্ঠী এবং সামান্তবাদী ও পুঁজিবাদী শ্রেণি সম্মিলিতভাবে সেই মহান উদ্দেশ্যকে পদদলিত করে পূর্ব পাকিস্তানকে লুণ্ঠনের লীলাভূমিতে পরিণত করে।

পাকিস্তানি শাসকচক্র রাজনৈতিক কলাকৌশলকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয় অত্যাচারের স্টিম রোলার। একই সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষণের পাঁয়তারা, রাজনৈতিক, সামরিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে ধোঁকাবাজি, প্রবন্ধানা ও শঠতার নীতি পূর্ব পাকিস্তানবাসীদের এক হতাশার গহ্বরে নিক্ষেপ করে।

আর এ হতাশার পট পরিবর্তন ও পশ্চিমাদের হীন রখানার তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় অবশ্যয়ারী হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক পটভূমি ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশ ভেঙে সর্বপ্রথম পাকিস্তান নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। আর এ রাষ্ট্র সৃষ্টির পিছনে যে কারণটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাহলো সামাজিক। নিম্নে সংক্ষেপে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক পটভূমি

০১। সাম্প্রদায়িক সংঘাত : পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক কারণ হিসেবে ১৯৪৬ সালে ভারতের অভ্যন্তরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে দায়ী করা যায় অনেকাংশে। কারণ ১৯৪৬ সালে ভারতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাতে প্রচুর মানুষ হতাহত হয়। এতে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার কারণে মুসলমানদের মাঝে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা জাগ্রত হয়।

০২। কংগ্রেস হিন্দু প্রাধান্য : ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক প্লাটফরম হিসেবে ১৮৮৬ সালে ‘সর্ব ভারতীয় জাতীয়
কংগ্রেস’ আত্মপ্রকাশ করে। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মূল কারণ ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সৃষ্টি ও ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ হতে
নিজেদেরকে মুক্ত করা। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, জাতীয় কংগ্রেসের হিন্দুদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায় এবং মুসলমানরা অবহেলিত হয়, যার ফলে অবহেলিত মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাঝে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের চেতনা জাগ্রত হয়।

০৩। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রভাব। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন প্রবর্তিত বঙ্গভঙ্গ ব্যবস্থার ফলে মুসলমানরা বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করে। মুসলমানদের ভোগকৃত এ ধরনের সুযোগ সুবিধা হিন্দুদের মনে হিংসার আগুন প্রজ্বলিত করে। যার ফলে তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। একক পর্যায়ে উগ্র হিন্দুদের অসহযোগ ও সন্ত্রাসী আন্দোলনের ফলে ১৯২২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। এতে হিন্দু ও মুসলিমদের মাঝে বিদ্যমান সম্প্রীতিতে ফাটল ধরে এবং মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আশা ব্যক্ত করে।

০৪। মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিকাশ লাভ: হিন্দুরা যখন জাতীয়বাদী আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে
বেগবান হয়ে উঠল তখন মুসলিম জাতীয়তাবাদীরাও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আলাদা রাজনৈতিক দল গঠনে এগিয়ে আসতে থাকল। এভাবে এক পর্যায়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।

পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি | ০৫। ব্রিটিশ শাসন পদ্ধতি: ব্রিটিশ শাসন পদ্ধতি ছিল মূলত Divide and Rule Policy. নির্ভর। অর্থাৎ বিভিন্ন জাতির মাঝে বিভেদ সৃষ্টি ও শাসন করা। ব্রিটিশরা ছিল মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবাপন্ন। তারা হিন্দুদেরকে যতবেশি প্রাধান্য দিতো তার সিকি ভাগও দিতো না মুসলমানদেরকে। সুতরাং, মুসলমান ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রতি ব্রিটিশদের এহেন অবহেলা এবং হিন্দুদের প্রতি অসহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব মেনে নিতে পারে নি। যার কারণে মুসলমানদের মাঝে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা কাজ করে।

০৬। হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও মুসলিমদের সাথে সংঘাত: ১৮৮৬ সালে Political Platform হিসেবে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার
মধ্য দিয়ে ভারতের ক্রমশ হিন্দু জাতীয়তাবাদের গোড়াপত্তন ঘটে। এতে হিন্দুদের শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। ফলে মুসলমানরা
হিন্দুদের একচেটিয়া আধিপত্যকে মেনে নিতে নারাজ ছিল, যা পরবর্তীতে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে সংঘাতের পথ সৃষ্টি করে।

০৭। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা : ১৮৮৬ সালে ২২ ডিসেম্বর ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাত প্রথম Political Platform All Indian National Congress প্রতিষ্ঠার পিছনে যে উদ্দেশ্য নিহিত ছিল তা পূরণে ব্যর্থ হয়। সেখানে বৈষম্য সৃষ্টি করে মুসলমানদেরকে অবহেলা করা হয় এবং সকল কার্যক্রমে হিন্দুদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয় Indian National Congress হিন্দুদের সংবিধানে পরিণত হয়। যার ফলে মুসলমরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম দেওয়া হয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯০৬ সালে। এর প্রথম সম্মেলন হয় ঢাকার শাহবাগে। মুসলিম দেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের নতুন রাষ্ট্র গঠনের চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে।

০৮। লাহোর প্রস্তাব: ১৯৩৯ সালের মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর Two Nations Theory-এর ভিত্তিতে পাকিস্তানে সালে শেষে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক লাহোরে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উক্ত প্রস্তাবের মধ্যে বলা হয় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা হবে এবং এ দাবির প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের পাকিস্তান নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।

পাকিস্তান সৃষ্টির সামাজিক পটভূমি || ০৯। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবধান: ব্রিটিশ শাসনামলে এ উপমহাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ইংরেজ কর্তৃক ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে হিন্দু সমাজ এ ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থাকে সহজে গ্রহণ করে, কিন্তু মুসলিম সমাজ এটিকে সহজে মেনে নেয় নি। অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। এতে করে শিক্ষা দীক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তারা হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় এ উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়ে পড়ে এবং তা অর্জনে ক্ষেত্রবিশেষ হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। বস্তু, এ বিবাদই মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র্য আবাস তথা পাকিস্তান সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করে।

১০। ক্রীপস মিশন : ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন মন্ত্রী স্ট্যাফোর্ড ক্রীপসকে ভারতের বিবদমান রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনের নিমিত্তে পাঠান তিনি সরেজমিনে ভারতীয় উপমহাদেশের সার্বিক সমস্যাসমূহ প্রত্যক্ষ করে প্রস্তাব করেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিসমাপ্তির পর ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা প্রদান করা হোক। কিন্তু ক্রিপসের এ প্রস্তাব তৎকালীন হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রত্যাখ্যান করে এবং ধর্মীয় জাতীয়তা ভিত্তিতে পৃথক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রে সৃষ্টির জোর দাবি জানায়। বস্তুত, এ কারণেও পাকিস্তান নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

আরো পড়ুুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!