ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ কমতে থাকার প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি হয়। গত কয়েক সপ্তাহ প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি লকগেটের সবকটি খুলে দিয়েছে ভারত। এতে বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমের কয়েকটি জেলায় বন্যা ও নদী ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিহার এবং উত্তর প্রদেশের বেশ কয়েকটি শহরে বন্যা হওয়ায় গতকাল সোমবার এই গেটগুলো খুলে দেয় তারা। এ নিয়ে গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে, প্রতিবছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খোলা থাকে যা নিয়মিত ব্যবস্থাপনারই অংশ।

পানি ভাগাভাগি হয় কীভাবে?

ভারত কোন মৌসুমে এই বাঁধের স্লুইস গেট বন্ধ রাখবে, কখন খুলে দেবে, সে বিষয়ে ফারাক্কা পানি বণ্টন চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারত কী পরিমাণ পানি পাবে সেটা নির্ভর করবে উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, পানির প্রবাহ ও গতিবেগের ওপর।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ কমতে থাকার প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তি হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১শে মে পর্যন্ত দুই দেশ চুক্তিতে উল্লেখিত ফর্মুলা অনুযায়ী পানি ভাগাভাগি করে নেবে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম পানি থাকলে দুই দেশ সমান সমান পানি ভাগ করে নেবে। পানির পরিমাণ ৭০ হাজার কিউসেক থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে ৪০ হাজার কিউসেক পাবে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট প্রবাহিত হবে ভারতে। আবার নদীর পানির প্রবাহ যদি ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হয় তাহলে ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাবে ভারত। অবশিষ্ট পানি প্রবাহিত হবে বাংলাদেশে। তবে কোন কারণে যদি ফারাক্কা নদীর পানির প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নীচে নেমে যায় তাহলে দুই দেশে কে কি পরিমাণ পানি পাবে সেটা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।

কোন মৌসুমে কে কতো পানি পাবে?

বাংলাদেশ ও ভারত যার যার ন্যায্য হিস্যা পেল কিনা সেটা এই জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে দুই দেশের নদী কমিশনের পর্যবেক্ষণ দল। বাংলাদেশে কী পরিমাণ পানি প্রবেশ করছে বা সরে যাচ্ছে সেটা পরিমাপ করা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে। অন্যদিকে ভারতের অংশে দৈনিক পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড করা হয় ফারাক্কা ব্যারেজের নীচে, ফিডার ক্যানেলে এবং ন্যাভিগেশন লকে। জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ বর্ষা মৌসুম জুড়ে পানি কী পরিমাণ আটকে রাখা হবে বা ছাড়া হবে সেটা নির্ভর করে ভারতের অংশে গড় বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি প্রবাহের ওপর।

বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক মাহমুদুর রহমান জানান, “ফারাক্কা বাঁধের সামনে যে পন্ড থাকে, সেখানে পানির উচ্চতা মাপার জন্য একটি রেকর্ডিং লেভেল থাকে যে এই পর্যন্ত পানি ধরে রাখলে বাঁধের কোন ক্ষতি হবে না। পানি ওই ডেঞ্জার লেভেল অতিক্রম করলেই তারা গেটগুলো একে একে খুলে দিয়ে পানি ছাড়তে থাকে। না হলে পুরো বাঁধ পানির তোড়ে ভেসে যাবে। বাংলাদেশ যেহেতু ভাটির দেশ তাই সমুদ্রে যাওয়ার আগে সেই পানির ধাক্কাটা আমাদের ওপর দিয়েই যায়। এরপর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পন্ডে পানির লেভেল অনুযায়ী পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

সানজানা চৌধুরী | বিবিসি বাংলা, ঢাকা

আরো পড়ুন: