যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা | ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্তির পরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের-২১ দফা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কার্যত ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামীলীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, নেজাম-ই-ইসলাম, গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে যে নির্বাচনী জোট গঠিত হয় তাই যুক্তফ্রন্ট নামে পরিচিত। যুক্তফ্রন্ট তাদের ২১ দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নিচে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবি তুলে ধরা হলো:


যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা:

০১। ভাষা প্রসঙ্গ: বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে।
০২। জমি প্রসঙ্গ: বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ করা হবে।
০৩। শিল্প প্রসঙ্গ: সমবায় শিল্প প্রথা প্রতিষ্ঠার দ্বারা কুটিরশিল্প ও শ্রম শিল্পের উন্নতি সাধন করা হবে।
০৪। পাট সম্পর্কিত: পাট ব্যবসা জাতীয়করণ এবং পাটের ন্যায্যমূল্য প্রদান করা হবে।
০৫। লবণ শিল্প: সমুদ্র উপকূলে কুটির শিল্প ও বৃহৎ শিল্পের লবণ তৈরির কারখানা স্থাপন করা হবে।
০৬। বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে আবাসিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে।
০৭। শিল্প প্রতিষ্ঠান: পূর্ব-বাংলায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনপূর্বক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিধান অনুযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা করা হবে।
০৮। দুর্নীতি ও ঘুষ বন্ধ: সকল প্রকার দুর্নীতি ও ঘুষ বন্ধ করা হবে।
০৯। শ্রমিকদের পুনর্বাসন: সকল কারিগরি ও শিল্প শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
১০। বর্ধমান হাউজ: ঢাকার বর্ধমান হাউজকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণাগারে পরিণত করা হবে।
১১। ২১শে ফেব্রুয়ারির মর্যাদা: ২১শে ফেব্রুয়ারীকে শহিদ দিবস ও ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
১২। প্রশাসন বিভাগ: প্রশাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রীকরণ, বিভিন্ন নিরাপত্তা আইনে ধৃত সকল রাজবন্দিদের মুক্তি এবং সভা-সমিতি, প্রেস ও বাকস্বাধীনতা প্রদান করা হবে।
১৩। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ: বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ হতে পৃথকীকরণ করা হবে।
১৪। প্রাথমিক শিক্ষা: বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন প্রদান করা হবে।
১৫। মাধ্যমিক শিক্ষা: সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করা হবে।
১৬। কর্মচারীদের বেতন: উচ্চ ও নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের বেতন হারের পুনবিন্যাস এবং মন্ত্রীদের বেতন এক হাজার টাকার অধীক করা হবেনা।
১৭। বন্যা প্রতিরোধ: বন্যা ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১৮। স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, করাচি থেকে নৌবাহিনীর সদরদপ্তর পূর্ব-বাংলায় স্থানান্তরিত করা হবে।
১৯। শহিদ মিনার নির্মাণ: ২১ ফেব্রুয়ারির বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতিতে একটি জাতীয় শহিদ মিনার নির্মাণ করা হবে।
২০। মন্ত্রীসভার পদত্যাগ: স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার জন্য সাধারণ নির্বাচনের ৬ মাস আগে মন্ত্রীসভা পদত্যাদ করতে হবে।
২১। শূণ্য পদে নিয়োগ: যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার আমলে আইনসভার কোনো সদস্যা পদ খালি হলে ৩ মাসের মধ্যে সে শূণ্যপদ পূরণের জন্য উপনির্বাচন ব্যবস্থা করা হবে।


যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা | উপরিউক্ত, ২১ দফা কর্মসূচীকে সামনে রেখে যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয় এবং নিরঙ্কুর বিজয় বয়ে আনে। যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্ত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। নিম্নে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল তুলে ধরা হলো:


রাজনৈতিক দলপ্রাপ্ত আসন
যুক্তফ্রন্ট২২২ টি
মুসলিম লীগ৯ টি
স্বতন্ত্র৫ টি
খেলাফতে রব্বানী১ টি
কংগ্রেস২৪ টি
সংখ্যালঘু যুক্তফ্রন্ট৯ টি
গণতন্ত্রী দল২ টি
কম্যুনিস্ট পার্টি৫ টি
তফসিলী ফেডারেশন ও স্বতন্ত্র২৯ টি
বৌদ্ধ২ টি
খ্রিস্টান১ টি

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ববঙ্গ আইনসভার মোট আসন ছিল ৩০৯ টি। পৃথক নির্বাচন পদ্ধতির আওতায় মুসলিম আসন ২৩৭ টি এবং অমুসলিম আসন হচ্ছে ৭২ টি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, উপরের চার্টে প্রথম চারটি দল হলো মুসলিম আসনের দল এবং বাকিদলগুলো হলে অমুসলিম আসনের দল।


যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা | তথ্য সংগ্রহ করে লিখেছেন: Al-Amin Islam

আরো পড়ুন: