রাষ্ট্রভাষা

রাষ্ট্রভাষা | মানব-বিকাশের এক উচ্চতর স্তরে ভাষার উদ্ভবের পর ব্যক্তিগত মালিকানার উদ্ভব। সে পর্যায়েই সম্পত্তিতে অধিকার ও বঞ্চনার ভিত্তিতে শ্রেণি বিভক্ত সমাজের সূচনা, ব্যক্তিক সম্পত্তি তথা শ্রেণিগত সুযোগ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের তাগিদে রাষ্ট্রের সৃষ্টি। এ রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ পরিচালনায় ব্যবহৃত ভাষাই রাষ্ট্রভাষা।

রাষ্ট্রভাষা

সমাজের বিবর্তন-ধারায় ক্রীতদাস প্রথা, ভূমিদাস প্রথা ও মজুরীদাস প্রথা যথাক্রমে অভিজাততন্ত্রী, সামন্ততন্ত্রী ও ধনতন্ত্রী রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্রষ্টা। এ-ধরনের প্রতিটি ব্যবস্থায়ই রাষ্ট্রযন্ত্র সেই শ্রেণিটির করায়ত্ব, যে-শ্রেণি উৎপাদনের সাধন বা উপায়গুলোর স্বত্বাধিকারী। সে-স্বত্বাধিকারী রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারক ও বাহক শ্রেণিটির আপন স্বার্থেই, অপরাপর শ্রেণি থেকে একটি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার আবশ্যকতা অনুভূত।

রাষ্ট্রভাষা | সে-অনুভূতি চরিতার্থতার তাগিদেই, অনেক ক্ষেত্রে, রাষ্ট্র-পরিচালনার কাজে এমন কোনো ভাষা ব্যবহৃত, যা সে রাষ্ট্রের আপামর সাধারণের মাতৃভাষা থেকে দূরবর্তী। যেমন ‘অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পত্তনের আগে রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন ছিল সামন্তযুগীয় রাজতন্ত্র, যখন শাসকগোষ্ঠী দেশের জনসাধারণ থেকে আলাদা ও উচ্চতর জীব হিসেবে একটা বিশেষ মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন শ্রেণি (Privileged Class) বলে নিজেদের জাহির করত, তখন রাজদরবারে ব্যবহৃত হতো একটি বিশেষ ভাষা (Court Language) যে-ভাষা অধিকাংশ জনসাধারণের ভাষা হতে পৃথক ছিল।”

দৃষ্টান্ত বাংলায় সেন রাজাদের আমলে রাজসভায় সংস্কৃত ও নবাবী আমলে ফারসী ভাষার ব্যবহার। বাংলায় বহিরাগত ও বহির্জাতীয় শাসনে এ-অবস্থাই পরিদৃষ্ট। শুধু বাংলায় নয়, পৃথিবীর বহু দেশেই অনুরূপ ব্যাপার লক্ষণীয়। একাদশ শতাব্দীতে নর্মান জাতির দ্বারা বিজিত ইংল্যান্ডের ইতিহাস এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। বিজেতা নির্মাণ ও বিজিত এ্যাংলোসেক্সনদের অসম সম্পর্কের ফলে ভাষার ওপরেও কেমন করে শাসক-শাসিতের ভেদচিহ্ন অঙ্কিত, ওয়াল্টার স্কটের উপন্যাস ‘আইভানহো’তে এর কৌতুকাবহ পরিচয় বিধৃত।

রাষ্ট্রভাষা | ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস বেত্তার জবানীতে সে পরিচয়ের সামান্য দৃষ্টান্ত এ রকম, “নর্মানরা প্রভু, সুতরাং ক্ষমতা ও আরাম উপভোগের সব বিচিত্র ব্যবস্থাই তাদের করায়ত্ত, ইংরেজি দাস, লাঞ্ছনা ও অপমানের কাজগুলোতেই তাহাদের অধিকার সীমাবদ্ধ; গরু চরান, মেষ-প্রতিপালন প্রভৃতি নিম্নশ্রেণির কাজ তাদের। ইতর প্রাণীরা যতদিন বাঁচিয়া থাকে, যতদিন তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়, ততদিন তাহাদের ইংরেজি নাম থাকে; কিন্তু যে-মুহূর্তে তাহারা মরিয়া রন্ধনের উপকরণে অপরিবর্তিত হয়, ভোজ্যদ্রব্যে রূপান্তরিত হইয়া খানার টেবিরে সজ্জিত হয়, তখনই তাহার ইংরেজি নাম বিসর্জন দিয়া নর্মান নামে পরিচিত। ‘Sheep’ কথাটি ইংরেজি, Mutton নর্মান; Deer ইংরেজি, Venison নর্মান। এ ভাষাবৈষম্যের মধ্য দিয়ে তখনকার ইতিহাস সুন্দরভাবে প্রতিবিম্বিত হইয়াছে।” এ ভাষাবৈষম্য সব দেশেরই বিজাতীয় শাসনের বৈশিষ্ট্য।

বহু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত দেশে কোনো বিশেষ ভাষা যখন রাষ্ট্রভাষারূপে ঘোষিত। তখন ‘রাষ্ট্র ভাষা’ শব্দটিই তাৎপর্যহীনতায় পাণ্ডুর, এর সর্বাঙ্গে যথেচ্ছাচার, বঞ্চনা ও অধিকার হরণের কলঙ্কচিত্র অঙ্কিত। তাই এ কালের সচেতন সংগ্রামী সুধীজনের মননে অব-চৈতন্য জাগ্রত যে ‘রাষ্ট্রভাষা’ শব্দটার উৎপত্তি বা মানে হলো অন্যান্য ভাষাকে বাদ দিয়ে বিশেষ কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রে বিশেষ মর্যাদা দেয়া। ‘রাষ্ট্রভাষা’ শব্দটার সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্বৈরাচার ও বৈষম্যমূলক নীতি। কিন্তু আমরা ভাষার ক্ষেত্রে স্বৈরাচারও চাই না, বৈষম্যমূলক আচরণও চাই না।

আমরা চাই ভাষার ক্ষেত্রে সব ভাষাভাষী জনগণের পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ও সমান অধিকার। এ-দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে আমাদের আন্দোলন দাবি থেকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ শব্দটি বাদ দেয়া প্রয়োজন। গণআন্দোলনের দাবির ভেতর কোনো দ্ব্যর্থবোধক বা ভুল অর্থবাহক শব্দ ব্যবহার করা ঠিক নয়।” ‘রাষ্ট্রভাষা’ কথাটি যদি প্রয়োগ করতেই হয়, তবে একটি রাষ্ট্রে প্রচলিত সব ভাষা সম্পর্কেই তা প্রযুক্তি ও স্বীকৃত হওয়া বাঞ্ছনীয় অন্যথায় তা অপপ্রয়োগ এবং অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

আরো পড়ুুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!